
নিজস্ব প্রতিবেদক:
সাবেক জনপ্রশাসন সচিব এ এফ এম সোলাইমান চৌধুরী বলেন, দেশের উন্নয়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব অপরিহার্য। দেশ ও জাতিকে সঠিক নেতৃত্ব দেয়ার জন্য কিছু সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের প্রয়োজন। জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে দীর্ঘদিন থেকে চলে আসা বৈষম্য ও বিভেদের অবসান হলেও সত্যিকারের বৈষম্য এখনো দূর হয়নি। দেশে বিভিন্ন জায়গায় প্রভাবশালীদের দৌরাত্ম, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও খুন- খারাপির কারণে মানুষ আতংকিত হচ্ছে।
শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) বিকেলে ময়মনসিংহ জেলা পরিষদ মিলনায়তনে গ্লোবাল লেবার এন্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন কর্তৃক আয়োজিত মাদক বিরোধী আলোচনা সভা ও জিএনএনটিভির শুভ উদ্বোধন করা হয়। এ সময় সুবিধা বঞ্চিত প্রতিবন্ধীদের মাঝে নগদ অর্থ সহায়তা ও উপহার সামগ্রী প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ এফ এম সোলাইমান চৌধুরী বলেন, যে স্বপ্ন নিয়ে তরুণ প্রজন্ম বন্দুকের সামনে বুক পেতে দিয়েছিল সেই স্বপ্ন এখনো বহুদূর। একটি সুখী, সমৃদ্ধশালী ও বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে তারা জীবন বিলিয়ে দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব অপরিহার্য। সেই কাঙ্ক্ষিত সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশ এবং জাতির জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
তিনি আরো বলেন, দেশের যুব সমাজকে বিগত সময় বিপথে পরিচালিত করা হয়েছিল। সুপরিকল্পিত ভাবে ভারত ও মিয়ানমার থেকে মাদক এনে যুব সমাজকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিলো। মাদকের বিক্রি ও সেবনের সঙ্গে যারা জড়িত তাদেরকে আইনের হাতে তুলে দিতে হবে। মাদক থেকে যুব সমাজকে মুক্ত রাখতে গ্রামেগঞ্জে খেলাধুলা ও সুস্থ সংস্কৃতি চর্চার আয়োজন করতে হবে। যুব সমাজকে ধ্বংসের অপচেষ্টাকে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপত্বি করেন, সংগঠনের চেয়ারম্যান লেখক, কবি আব্দুল্লাহ আল মামুন। অনুষ্ঠিত প্রোগ্রাম উদ্বোধন করেন, সরকারের সাবেক অতিরিক্ত সচিব পীরজাদা শহিদুল হারুন, প্রধান বক্তা ছিলেন মো. রকিবুল ইসলাম পুলিশ সুপার ( পিবিআই) ময়মনসিংহ।
অনুষ্ঠানে মুখ্য আলোচক ছিলেন, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান হামদুল্লাহ আল মেহেদী। বিশেষ অতিথি ছিলেন, ময়মনসিংহ সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের (মহিলা) প্রিন্সিপাল অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, শহীদ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও আইসিইউ প্রধান অধ্যাপক ডা. মোস্তাফিজুর রহমান আকাশ, জিএনএন টিভির উপ-ব্যাবস্থাপনা পরিচালক ফজলুর রহমান পলাশসহ আরো অনেকে।
এ সময় সংগঠনের পক্ষ থেকে ৩৬ জন প্রতিবন্ধীকে প্রয়োজনীয় উপহার সামগ্রী প্রদান করা হয়। এ ছাড়াও ময়মনসিংহ জেলা প্রতিবন্ধী কল্যাণ সোসাইটির উন্নয়নের স্বার্থে আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয়।
সভাপতির বক্তব্যে কবি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, অসহায় সুবিধা বঞ্চিত প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে সাধ্যের সবটুকু দিয়ে কাজ করে যাবে গ্লোবাল লেবার এন্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন। এ সময় তিনি সমাজের বিত্তবানদের নিরিহ নিপিড়ীত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানান। এদেশে রাজনৈতিক শক্তির চেয়েও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ক্ষমতা অনেক বেশি। বিষয়টি নিছক বিনোদন নয়; এটি এক নীরব, পরিকল্পিত ও সুদূরপ্রসারী মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ-যার লক্ষ্য আমাদের পরিবার, সমাজ এবং ধর্মীয় বিশ্বাসকে ভেঙে ফেলা।
ভারতীয় সিরিয়াল থেকে নারীরা কেবল কল্পনা নয়, কূটচাল ও ষড়যন্ত্রের শিক্ষাও নিচ্ছেন। সিরিয়ালে দেখা শাশুড়ি-বউয়ের চক্রান্ত, ননদের কূটনীতি এবং পারিবারিক বিশ্বাসঘাতকতার গল্পগুলো তারা অবচেতনভাবেই নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করতে শুরু করেন। সিরিয়ালগুলোর আরেকটি মারাত্মক দিক হলো, এগুলো ইসলামি পারিবারিক কাঠামোকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। ইসলাম নারী ও পুরুষের জন্য স্বতন্ত্র দায়িত্ব ও মর্যাদা নির্ধারণ করে দিয়েছে। কিন্তু সিরিয়ালে নারীদের এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন পুরুষের সব কাজ নারীও করতেই হবে এবং পুরুষ যদি কোনো দায়িত্ব পালন করতে পারে, নারী কেন পারবে না-এ প্রশ্নটিকে তুলে ধরে তারা ধর্মীয় ব্যবস্থাকেই চ্যালেঞ্জ করে। ফলে মেয়েরা অন্ধভাবে নারী স্বাধীনতার নামে এমন কিছু চিন্তা ও আচরণ গ্রহণ করে যা ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে অনুচিত এবং ঈমানহানিকর।
এছাড়া, এসব সিরিয়ালে নৈতিকতাহীন সম্পর্ক, অবৈধ প্রেম, পরকীয়া, মিথ্যা, ছলচাতুরি, এমনকি ধর্মীয় আচার-আচরণকে কুসংস্কার হিসেবে দেখানো হয়। এটি স্পষ্টত একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা, যার মাধ্যমে মুসলিম সমাজকে তার বিশ্বাস থেকে ধীরে-ধীরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আমাদের মেয়েরা, যাঁরা টেলিভিশনের পর্দায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা এসব সিরিয়ালে ডুবে থাকেন, তারা না বুঝেই মানসিক ও নৈতিক পরিবর্তনের শিকার হয়ে পড়ছেন। আমরা এমন পরিকল্পিত সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানাই। ভারতীয় সিরিয়াল শুধু বিনোদন নয়, এটি একটি ধ্বংসাত্মক বিষবৃক্ষ, যার শিকড় আমাদের পরিবার, সমাজ ও ধর্মের ভিতরে প্রবেশ করেছে। আমরা এর প্রভাব থেকে মুক্ত হতে চাই। আমরা চাই, আমাদের সমাজে এমন একটি পরিবেশ গড়ে উঠুক যেখানে সত্য, ন্যায়, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং পারিবারিক বন্ধনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, কল্পনার চোরাবালিতে হারিয়ে গিয়ে বাস্তবকে ধ্বংস করা নয়।
সরকারকে অবিলম্বে ভারতীয় চ্যানেল ও সিরিয়ালের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। এক্ষেত্রে তথ্য মন্ত্রণালয়, বিটিআরসি এবং সম্প্রচার নীতিমালার সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো সম্প্রচারের আগে কনটেন্ট যাচাই করার জন্য একটি আলাদা সেন্সর বোর্ড গঠন করা উচিত।
ভারতীয় সিরিয়াল আমাদের সমাজের নৈতিকতা, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসকে ভেঙে দিচ্ছে। এ নীরব আগ্রাসনকে আর নীরবে সহ্য করা যাবে না। আমাদের এখনই রুখে দাঁড়াতে হবে-রাষ্ট্রীয়ভাবে, সামাজিকভাবে এবং পারিবারিকভাবে। নয়তো খুব শিগগিরই আমরা দেখব-বাহ্যিকভাবে স্বাধীন, কিন্তু চিন্তা ও সংস্কৃতির দিক থেকে পরাধীন এক ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, যারা আর নিজেদের চিনবে না, বরং শুধু সিরিয়ালের চরিত্রগুলোকেই বাস্তব।