চিত্রশিল্পী ও লেখক- মোঃ কায়জার রহমান
যারা ছবি আঁকে, তাদের উদ্দেশ্যে আমার চিন্তাভাবনা প্রকাশ করছি তারা বেঁচে থাকলে অনেক সময় অদৃশ্য। তাদের হাতের রেখা সমাজ বোঝে না।চোখে চোখ রাখে না কেউ।চিকিৎসার অভাবে তারা ক্লান্ত হয়ে মরে।তখন কেউ প্রশ্ন করে না“আজ তুমি ঠিক আছো কি?”তাদের শিল্পের মূল্য থাকে না। শিল্পী রাতে জাগে, সমাজের দোষ দেখিয়ে ছবি আঁকে।প্রতিটি পেইন্টিং একেকটি প্রতিবাদ।কিন্তু সমাজের মানুষ থামিয়ে দেয় না তাদের হাতে।অর্থ নেই পাশে, সহায়তা নেই পাশে।
শিল্পীর উদার মন থাকলেও শেষ বয়সের অভাব চাপিয়ে দেয়।তাদের প্রিন্টিং বিক্রি হয়, কিন্তু দামই ঠিকমতো নেই।চেষ্টা করে সমাজকে সুন্দর করতে, কিন্তু সমাজ উল্টো।মৃত্যুর পর হঠাৎ সেই শিল্পীর মূল্য বাড়ে।পেইন্টিং-এর দাম আকাশ ছুঁয়ে যায়।
কেন বেঁচে থাকতে নয়?কেন মৃত্যুর আগে কেউ বুঝে না তাদের কষ্ট?কেন সরকার, সমাজ, মানুষ দেয় না সঠিক মান? শিল্পীর মন অশ্রুতে ভরা।
রাত দিন তারা চিন্তা করে সমাজের জন্য।
প্রতিটি ছবি একেকটি গল্প বলে, সমাজের গল্প।
শিশুদের শৈশব, কৃষকের জীবন, শহরের রোদ, গ্রামের আকাশ।সেই সব কিছু ক্যানভাসে তুলে ধরে তারা।কিন্তু বেঁচে থাকার সময় তা মূল্য পায় না।
মানুষ মনে করে“এটাই শিল্পী।”কিন্তু সত্য হল, শিল্পী মানুষ।তাদের অবদান সমাজের জন্য অপরিসীম।তাদের হাসি, কান্না, প্রচেষ্টা, স্বপ্নসবই অদৃশ্য।যে ছবি সমাজের অন্যায় প্রকাশ করে, তা সমাজ বোঝে না।শিল্পীর হাতের প্রতিটি রেখা চুরি হয় না, কিন্তু প্রশংসা হয় না।সবার চোখে তারা অদৃশ্য।মৃত্যুর পর মানুষ বলে“কি অসাধারণ শিল্পী!”কিন্তু বেঁচে থাকলে কেউ বোঝে না।
শিল্পীর হৃদয় ভেঙে যায়।অবহেলায় তারা একা।
তবু আঁকে, তবু প্রতিবাদ করে, তবু স্বপ্ন দেখে।
শিল্পীর চোখে গভীর কান্না।হৃদয়ে অগাধ দুঃখ।
কিন্তু তারা আশা রাখে। সমাজের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য।নিজেদের স্বপ্নের জন্য।কেন বেঁচে থাকার সময় শিল্পীকে না বোঝা হয়?কেন তাদের পাশে কেউ দাঁড়ায় না?কেন তাদের অবদান দেখা যায় না? মৃত্যুর পর সবাই তাদের পাগল মনে করে।
কিন্তু বেঁচে থাকলে কেউ পাগল মনে করে না।
শিল্পীর শিল্প জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত গোপন।
প্রতিটি রেখা, প্রতিটি ছোঁয়া, প্রতিটি রঙ সবই সমাজের জন্য।কিন্তু সমাজ ফিরে দেয় না ভালোবাসা।কেন মৃত্যু পরবর্তী স্বীকৃতি আগে না?
এটা কি ন্যায়?শিল্পী মরলে দাম বাড়ে, নাম চিরস্থায়ী হয়।কিন্তু বেঁচে থাকলে তারা খালি চোখে বাঁচে।কেন এই অবিচার? কেন বেঁচে থাকা শিল্পীকে আমরা এভাবে ছেড়ে দিই? এটাই সমাজের ব্যথা, শিল্পীর ব্যথা।আমরাও সমাজের অংশ।
আমরা শিল্পীকে দেখব, পাশে দাঁড়াব।তাদের স্বপ্ন পূরণে সহায় হব। নয়তো অগোছালো সমাজে শিল্পী নিঃস্ব হবে।নয়তো তাদের প্রতিভা কেবল মৃত্যুর পরে স্বীকৃতি পাবে।শিল্পীর প্রতিটি রেখা, প্রতিটি ছবি, প্রতিটি প্রচেষ্টা আমাদের চোখে পড়া উচিত।বেঁচে থাকার সময় মূল্য দিতে হবে।
মৃত্যুর পর নয়। আমরা যদি আজ সঠিক মূল্য দিই,
শিল্পীর জীবন হবে সার্থক।শিল্পীর চোখের অশ্রু আনন্দে পরিণত হবে।হৃদয়ে শান্তি ফিরে আসবে।
তাদের প্রতিভা সমাজকে সুন্দর করবে।আমরা বুঝব, শিল্পী শুধু শিল্পী নয়।শিল্পী আমাদের সমাজের হৃদয়।শিল্পীর প্রতি আমাদের দায়িত্ব, আমাদের কর্তব্য।বেঁচে থাকা শিল্পীকে আমরা ভুলে যাব না।আমরা দেখাব, আমরা মূল্য দিই।
এটাই প্রকৃত মানবিকতা।এটাই প্রকৃত ন্যায়।
শিল্পী বাঁচুক, শিল্পী সুখী হোক।শিল্পী যাতে নিজের হাতের কাজ দেখার আনন্দ পায়।শিল্পী যেন না মরেও অদৃশ্য হয়।এটাই আমাদের প্রতিজ্ঞা।
শিল্পীকে আমরা ছাড়ব না।
লেখকের পরিচিতিঃ শিল্পীর বাড়ি আর্ট একাডেমি
প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মোঃ কায়জার রহমান, মিরপুর, ঢাকা।